প্রাক-স্বাধীনতা পর্বে পুরুষতান্ত্রিক ভারতীয় সমাজে নারী স্বাধীনতা ও অধিকার
অর্জনেঃ ভারতীয় নারী সমাজ। - জুই সাহা
বর্তমান ভারতীয় সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্তিক। সমাজে
নারীরা আজ দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত, কিন্তু এই ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট কারণ ভারতীয়
ইতিহাসে তেমন ভাবে পাওয়া যায় না। আবার সৃষ্টির আদিকাল থেকে যে এমন ব্যবস্থা চলে
আসছে; তেমনটাও নয়। একটি আদর্শ সমাজ গঠনে একজন পুরুষের
যতটা অবদান, একজন নারীরও ঠিক ততটাই অবদান। ‘Women as Force in History: A Study in
Traditions and Realities’ –এ Mary R. Beard –বলেছেন যে, “Women were History makers just like men but had been left
out of the narrative.”
প্রাক-বৈদিক যুগে নারীরা সমাজে সম্মাননীয় স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন; এমনকি তাদের
অনেকেই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিতা, কিন্তু পরবর্তী বৈদিক যুগে তাদের উপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপিত হতে থাকে। ‘মনুসংহিতা’-এ বলা হয় যে, “একজন নারী স্বয়ংশাসিত
থাকার উপযুক্ত নয়।” আবার, মধ্যকালীন ভারতীয় সমাজে নারীদের গৃহের
অভ্যন্তরে বেঁধে ফেলার এক নিষ্ঠুর প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। গৃহের অন্দরমহলেও তাদের
পর্দার আরালে নিবদ্ধ করা হয়; এমনকি ‘বাল্যবিবাহ’, বিধবাদের পুনর্বিবাহে নিষেধাজ্ঞা, ‘সতীদাহ’ এই বিষয়গুলি ভারতের কিছু সম্প্রদায়ের
সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই বিধিণিষেধের মধ্যেও কয়েকজন নারী নিজেদের
স্বয়ং সম্পূর্ণা হবার পরিচয় দিয়েছেন।
ঊনবিংশ শতকে ভারতে পাশ্চাত্য আদর্শে অনুপ্রাণীত হয়ে কয়েকজন
সমাজ সংষ্কারক নারীদের অবস্থার উন্নতির জন্য আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে গেছেন। সামাজিক কুসংষ্কার
যেমন- ‘সতীদাহ’, ‘বাল্যবিবাহ’, কুলীন ব্রাহ্মণদের ‘বহুবিবাহ প্রথা’, ‘পর্দাপ্রথা’
ইত্যাদি বিষয়গুলির বীরুদ্ধে জনগনকে সচেতন করার লক্ষ্যে তাঁরা শোচ্চার হন। ১৮২৯
সালে ৪-ঠা ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক কর্তৃক ‘সতীদাহ প্রথা” নিষিদ্ধকরণ এবং
১৮৫৬ সালে ২৬-শে জুলাই লর্ড ডালহৌসি কতৃক ‘বিধবা বিবাহ’ আইন পাশের ক্ষেত্রে
যথাক্রমে- রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর –এর অবদান অবিস্মরণীয়।
তাঁদের এই প্রচেষ্টা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীসহ সমাজের সকল স্তরের মহিলাদের অনুপ্রাণিত
করেছিল; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘Women in Colonial India:
Essays on Politics, Medicine and Historiography’ –এ Geraldine Forbes –ভারতীয় নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকার একটি কালানুক্রমিক বিবরণ
তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর লেখায় ভারতীয় নারীর চেতনা ও বিকাশের সীমাবদ্ধতার দিকগুলি
আলোচনা করেও এর মধ্যে নিহিত এক আত্মচেতনা তথা স্বীকৃতির তাগিদকে উল্লেখ করেছেন। এই
আত্মচেতনাই ভারতে সংগঠিত ‘নারী আন্দোলন’ –কে অনুপ্রাণিত করেছিল।
এই আত্মচেতনা পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল
‘নারীশিক্ষা’–র উপর গুরুত্ব দান। এই বিষয় Geraldine
Forbes –তাঁর গ্রন্থে
বলেছেন যে, “Efforts to provide education for Indian females
had begun early in the nineteenth century, but these efforts met with little
success until the idea of female education had gained respectability amongst
the intelligentsia.”১ ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে সংষ্কারপন্থীদের তৈরী
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নারীদের শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেওয়া হতে থাকে। তবে, এক্ষেত্রে প্রথম
উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল খ্রিষ্টান মিশনারীরা। ‘স্ত্রীবিদ্যা’ –এ বলা হয়েছে যে,
“একজন সুশিক্ষিতা মা–ই একজন সুসন্তানের জন্ম দিতে পারে”২ –এটিই ছিল
বাংলায় নারী শিক্ষার প্রচারক ও সমর্থনকারীদের অন্তর্নিহিত তাগিদ। সেইসঙ্গে নারী
শিক্ষার মাধ্যমে পারিবারিক ও সামাজিক উপকারিতার বিষয়টি ইঙ্গিত করতেও সংস্কারকরা পিছপা
হননি। কৈলাসবাসিনী দেবী -তাঁর ‘হিন্দু অবলাকুলের বিদ্যাভাস ও সমুন্নতি’ –গ্রন্থে
বলেছেন যে, “জমিদার পরিবারের মহিলাদের সম্পত্তির রক্ষার জন্য শিক্ষাদান করা হত;
কিন্তু এই শিক্ষা ছিল নিতান্তই প্রাথমিক স্তরের।”৩ প্রসংগত, ‘নারীচেতনা
ও সংগঠন; ঔপনিবেশিক বাংলা, ১৮২৯-১৯২৫’ –গ্রন্থে সারদা ঘোষ –বলেছেন যে, “ঊনিশ শতকে
বাংলায় নারী শিক্ষা সম্পর্কে যে তর্ক-বিতর্ক দেখা যায় তা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট
হয়ে ওঠে যে এই শিক্ষার মূল লক্ষ্য কখনোই নারী জাতির আত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ ছিলনা,
কারণ এই শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা ছিল পুরুষ সংষ্কারকদের। ফলে নারী শিক্ষার মধ্যে
একদিকে যেমন প্রগতির কথা বলা হয়, অন্যদিকে সমাজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণও যাতে বজায়
থাকে সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া হয়।”৪
উল্লিখিত বিষয় সম্পর্কে সমকালীনপর্বে নারীরাও পরিচিত ছিলেন;
সুতরাং সমাজে নিজেদের স্থান ও মর্যাদা দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য
প্রয়োজন মিলিত শক্তিজোটের। এই শক্তিজোটকে সমাজের সকল নারীর মধ্যে জাগিয়ে তোলার
জন্য কার্যকরী মাধ্যম হল সংগঠন। প্রথম দিকের গড়ে ওঠা মহিলা সংগঠনগুলি সমাজ
সংষ্কারকদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠতে থাকে; এরই একটি উদাহরণ হল, ১৯০৪ সালে সংগঠিত
‘ভারতীয় মহিলা পরিষদ’। এই ধরনের সংগঠনগুলিকে বলা হত ‘মহিলা সংগঠন’। এই সংগঠনগুলিতে
আলোচ্য বিষয় ছিল মূলত নারীসমস্যা কেন্দ্রিক এবং সেগুলিকে দূর করা সম্ভব; তাদের
তালিকায় সবচেয়ে আবশ্যিক কাজ হল, নারীশিক্ষার পরিপূর্ণ বিস্তার। প্রসংগত, Geraldine Forbes -তাঁর “Women in Colonial India: Essays on Politics, Medicine, and Historiography”
–গ্রন্থ (p- 13) -এ বলেছেন যে, “As women
became literate and found a ‘voice’, they were able to express their own
version of women’s positions, grievances, and solutions. The early works of
these women manifest a deep concern with ‘tearing the purdah’, ‘breaking out of
the cage’, and ‘escaping from bondage’.”৫
ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে মহিলাদের নিজশ্ব উদ্যোগে ও পরিচালণায়
গড়ে ওঠা নারী সংগঠনের দিকে ঝোঁক বাড়তে থাকে। এরপর গড়ে উঠতে থাকে নারীদের নিজস্ব
উদ্যোগে নারী সংগঠনগুলি; বস্তুত নারীচেতনা বিস্তার ও অধিকার সংরক্ষনের প্রশ্নে
নারী সংগঠনগুলির উপযোগিতা ছিল অনস্বীকার্য। এই উদ্যোগকে সাথে নিয়েই ১৮৮৬ সালে
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রতিষ্ঠা করেন ‘সখী সমিতি’। এই সমিতিকে ঔপনিবেশিক বাংলার
প্রাথমিক পর্যায়ের নারী সংগঠনগুলির দিক নির্দেশিকা বলা যায়। স্বর্ণকুমারী দেবী
ছিলেন জন্মসূত্রে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সাথে যুক্ত।৬ তাঁর বহুমুখী
প্রতিভআ ও বৈচিত্রময় জীবনের আরও একটি উল্লেখ্য দিক ছিল পত্রিকার সম্পাদনা।৭ অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ‘ভারতী’ ও পরে ‘ভারতী ও বালক’
পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করেন।৮ ১৮৮২-১৮৮৬ সাল
পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলায় প্রতিষ্ঠীত ‘Theological
Society’ –র সভানেত্রী।৯
‘সখী সমিতি’-র আর্থিক উন্নতির জন্য তিনি মহিলা শিল্পমেলার আয়োজন করেন। এই মেলা
প্রথম আয়োজিত হয় ১৮৮৮ সালে ২৯-শে ডিসেম্বর বেথুন কলেজের প্রাঙ্গনে।১০
এই সমিতির ব্যাপক প্রচার কাজ চলতো ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায়। এই পত্রিকা থেকেই জানা
যায় যে, সখী সমিতির মূল আর্থিক উৎস ছিল সদস্যাদের প্রদত্ত চাঁদা এবং
স্বেচ্ছাপ্রদত্ত আর্থিক সাহায্য। প্রথম পর্যায়ে কিছু সংখ্যক বিধবাকে বেথুন কলেজে
ভর্তি করা হয়। এছাড়া শিক্ষাগত ডিগ্রিপ্রাপ্ত বিধবারা গৃহশিক্ষিকার জীবিকা গ্রহণ
করেন; সমিতি তাদের বেতন দানের প্রতিশ্রুতিও দেয়। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভর
করে তোলার জন্য সেলাই, রন্ধনশিল্প, গৃহ কর্মের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।১১
বিংশ শতকের শুরু থেকে এমন অনেক মহিলার নাম পাওয়া যায় , যারা
নিজেরাই স্বয়ং সম্পূর্ণা হবার পরিচয় দিয়েছেন। এমনি দুজন মহিলা হলেন- সরলাদেবী
চৌধুরানী (১৮৭২-১৯৪৫), এবং সরজিনী নাইডু (১৮৭৯-১৯৪৯)। সরলাদেবী চৌধুরানী ১৯০৬-১৯১৪
সাল পর্যন্ত এককভাবে ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ‘জীবনের ঝড়াপাতা’ নামক তাঁর
আত্মজীবনী থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি ‘ভারত স্ত্রী
মহামন্ডল’ –এর প্রস্তাব দেন। এটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠীত হয় ১৯১০ সালে এলাহাবাদে। এই
বৈঠকে উপস্থিত মহিলারা পর্দার অন্তরালে যেসমস্ত মহিলারা ছিলেন; বিশেষত তাদের শিক্ষাদানের
উপর জোর দেন। এই মহামন্ডল অন্তঃপুরেই শিক্ষাদানের উপর জোর দেয়, যাতে তাদের
পারিবারিক নিয়ম-কানুনগুলি তাদের পথের বাঁধা না হয়ে ওঠে। এই মহামন্ডল বহু জায়গায়
তার শাখা বিস্তার করে; তবে এই উদ্যোগ প্রচুর ব্যয়বহুল হওয়ায় কিছু বছরের মধ্যে
কয়েকটি শাখাই অটুট ছিল। তবে, এই সংগঠন যে সমাজে তার প্রভাব বিস্তার করতে সফল
হয়েছিল; তা বলাই যায়। এছাড়া, বিপ্লবী কর্মতৎপরতার ক্ষেত্রেও সরলাদেবী একটি অতি
গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তিনি বাঙালি যুবকদের মধ্যে শারীরিক শক্তি চর্চার জন্য
প্রতিপাদ্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসব (১৯০৩ খ্রীঃ) চালু করেছিলেন। এই উৎসবগুলিতে
স্বদেশী ভাবাদর্শ প্রচারেরও চেষ্টা করা হত। ১৯০২ সালে তিনি সূচনা করেন ‘বীরাষ্টমী
ব্রত’; এখানে বঙ্গ যুবকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা ছিল। এর
মাধ্যমে সশস্ত্র বিপ্লবের উপযুক্ত করে এই যুবকদের প্রস্তত করা হত। আখাড়া ও ব্যায়াম
সমিতি গঠনের মাধ্যমে তিনি সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ট সংযোগ রক্ষা করে চলতেন।১২
এমনই আরও একজন সাহসীনি নারী হলেন সরজিনী নাইডু। তিনিও
নারীদের অবস্থার উন্নতির সাথে সাথে দেশের জন্যও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে
গেছেন। ‘Indian National Congress’ –এর প্রধান হিসেবে তিনি তাঁর বক্তৃতায় ভারতকে ‘House’, ভারতীয় জনতাকে ‘Members of the joint family’ এবং ভারতীয়
মহিলাদের ‘Mother’ –হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সরজিনী নাইডু এবং সেই সময়কার অন্যান্য নেত্রীরা
নারীদের ভোটাধিকার সংরক্ষন, সামাজিক কুপ্রথার বন্ধন থেকে মুক্তি, পুরুষদের
সমকক্ষতা অর্জনের জন্য গভীরভাবে প্রচারকার্য চালান এবং তাঁরা নারীদের উচ্চ শিক্ষার
প্রতিও জোর দিতেন।১৩ এমনকি তাঁরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনগুলিতেও গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী সর্বদাই চেয়েছিলেন যে, ভারতের জাতীয়তাবাদী
আন্দোলনে মহিলারাও অংশগ্রহণ করুক; কারণ তিনি মনে করতেন যে নারীরা যদি সচেতনভাবে
এগিয়ে না আসে, তাহলে ভারতে ‘স্বরাজ’ সহজে আসবেনা।
অন্যদিকে, রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে এবং নিজ জীবনের
নানান বিধিনিষেধ সত্তেও নারীশিক্ষা প্রসারে অগ্রগণ্য একজন নারী হলেন বেগম রোকেয়া
সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)। শিক্ষা বিষয়ে তাঁর স্ব-উক্তি হল “আমরা উচ্চশিক্ষা
প্রাপ্ত না হলে সমাজও উন্নত হবেনা।” বাল্যকালে তাঁর নিজ পরিবার তাঁকে শিক্ষালাভের
অনুমতি না দিলেও তিনি তাঁর জেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে গোপণে লেখাপড়া শেখেন। বিবাহের পরও
তাঁর স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন –এর পৃষ্ঠপোষ্কতায় তিনি নিজ প্রতিভাকে বিকশিত
করেন। সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন আধুনিক মনষ্ক, তিনি তাঁর স্ত্রী -কে লেখা-লিখির কাজে
উৎসাহ প্রদাণ করেন। ১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ –নামক একটি গল্প বেগম রোকেয়া লেখেন। তাঁর
সবচেয়ে উল্লেখ্য গ্রন্থ –‘Sultana’s Dream’, এছাড়াও ‘পদ্মরাগ’, ‘অবরোধ বাসিনী’, ‘মতিচূর’ –এর মতো
গ্রন্থগুলিতে তিনি নিজ মনভাব ব্যাক্ত করেন। ১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর ৫ মাস পর
ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস্ স্কুল’ –নামে একটি বালিকা বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু, পরবর্তীকালে কিছু সমস্যার কারণে তা বন্ধ করে তিনি কলকাতায়
আসেন এবং ১৯১১ সালে ১৫ –ই মার্চ কলকাতায় ১৩ নং ওয়ালীউল্লাহ্ লেনের বাড়িতে দ্বিগুণ
উদ্যোমে পুণরায় তিনি সেই বিদ্যালয় স্থাপন করেন। প্রাথমিক অবস্থায় এখানে ছাত্রীর সংখ্যা
ছিল খুবই কম। তিনি বুঝেছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া নারীর মুক্তি নেই। এমনকি মেয়েদের জন্য
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে তাঁকে কম গঞ্জনা শুণতে হয়নি। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের
বিদ্যালয় প্রেরণের জন্য তাদের অভিভাবকদের অনুরোধ করেন। একাজ সহজ না হলেও তিনি থেমে
যাননি। অমানসিক ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই বিদ্যালয়ে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর
সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৩০ সালে বিদ্যালয়টি হাইস্কুলে পরিণত হয়। ১৯২৬ সালে কলকাতায়
অনুষ্ঠীত বাংলার নারী বিষয়ক সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ত্ব করেন। এখানে তিনি নারীদের
প্রতি হওয়া অন্যায় গুলিকে তুলে ধরেন এবং সকলকে বোঝান যে, শিক্ষা ছাড়া নারীর মুক্তি
নেই। এক্ষেত্রে তাঁর স্ব-উক্তি প্রনিধানযোগ্য; তিনি বলেন যে “মেয়েদের এমন শিক্ষায়
শিক্ষিত করিয়া তুলতে হইবে যাহাতে তাহারা ভবিষ্যৎ জীবনে আদর্শ গৃহিনী, আদর্শ জননী
এবং আদর্শ নারী রুপে পরিচীত হইতে পারে।” তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী সমাজ সংষ্কারক। তাঁর
সমাজসেবা শুধু বিদ্যালয় তৈরী করা পর্যন্ত থেমে থাকেনি। ১৯১৬ সালে তিনি
বাঙ্গালী মুসলিম নারীদের জন্য একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে বিধবা নারীদের
কর্মসংস্থান, দরিদ্র অসহায় বালিকাদের শিক্ষা, বিয়ের ব্যবস্থা, দুস্থ মহিলাদের
কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ, নিরক্ষরদের অক্ষর জ্ঞান দান, এমনকি বস্তিবাসী মহিলাদের
স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এই প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।
সমকালীনপর্বে এমনি আরও অনেক নারীদের নাম পাওয়া যায়, যারা
তাঁদের হারভাঙা পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজে নিজেদের স্থান ও মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠীত
করার কাজে মনোনিবেশ করেন; তাঁরা তাদের কাজে বহুলাংশে সফলও হন। নারীদের এই
প্রতিবাদী আন্দোলন কতটা সফল হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় যে, বর্ত্মান
ভারতীয় সংবিধানে ১২ থেকে ৩৫ নং ধারায় যে মৌলিক অধিকারগুলি লিপিবদ্ধ রয়েছে; সেগুলির
অন্যতম হল- ‘সাম্যের অধিকার’। এই সমানাধিকার অর্জনের বিষয়ে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের
প্রতিবাদী নারীদের অবদান অবিস্মরণীয়। ‘নারী শ্রমিক ও শ্রম আইন’ –নামক এক্তি
প্রতিবেদনে সংবিধানের কয়েকটি সমানাধিকার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে; যথা-
সংবিধানের ১৪ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘রাষ্ট্রের বিচারে
আইনের চোখে সবাই সমান’।
১৫ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘ধর্ম, জাত, সম্প্রদায় এবং লিঙ্গ
নিয়ে কোনো ভেদাভেদ করা যাবেনা।
১৯ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘ক। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই
কথা বলা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাবেন। খ। শান্তিপূর্ণভাবে একজোট হতে পারবেন। গ।
নিজেদের সমিতি গড়তে পারেন,’ ইত্যাদি।
২১ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘মহিলা কিংবা পুরুষ যেই হোক তার
ব্যক্তিগত বাঁচার অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করা যাবেনা। একমাত্র আইন স্বীকৃত
পথে তা করা যাবে।’
২৩ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘শোষনের বীরুদ্ধে মহিলা, পুরুষ
যেকোনো ব্যক্তির বাঁচার কথা বলা আছে। এমনকি মানুষ মানুষের শরীর নিয়ে কোনোরকম
ব্যবসা করতে পারবেনা।১৪ এছাড়াও, আরও অনেক বিষয়ে মহিলাদের সমানাধিকার
স্বীকৃত হয়েছে।
তবে, একথা ঠিক যে আজও সমাজে বহু নারী নির্যাতন, নিপীড়নের
স্বীকার হচ্ছেন; এটি দূর করতে হলে প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি মানুষের সমাজ চেতনা ও
আত্মচেতনা বিকাশের।
শব্দঃ
নারী, শিক্ষিতা, বাল্যবিবাহ, সতীদাহ, নারীশিক্ষা, অধিকার, নারীসমাজ,
আত্মচেতনা।
তথ্যসূত্রঃ
১। Geraldine Forbes, Women in Colonial India: Essays
on Politics, Medicine and Historiography, New Delhi, 2005, p- 13.
২। ‘স্ত্রীবিদ্যা’, সম্বাদ প্রভাকর, ৭.৫.১৮৪৯
৩। কৈলাসবাসিনী দেবী, হিন্দু অবলাকুলের বিদ্যাভাস ও তাহার সমুন্নতি, কলকাতা ১৭৮৭
শকাব্দ, পৃ- ২৩-২৪।
৪। সারদা ঘোষ, নারীচেতনা ও সংগঠনঃ ঔপনিবেশিক বাংলা, ১৮২৯-১৯২৫, কলকাতা ২০১৩,
পৃ- ৫৩।
৫। Geraldine Forbes, Women in Colonial India: Essays
on Politics, Medicine and Historiography, New Delhi, 2005, p-13.
৬। সারদা ঘোষ, নারীচেতনা ও সংগঠনঃ ঔপনিবেশিক বাংলা, ১৮২৯-১৯২৫, কলকাতা ২০১৩,
পৃ- ৭৯।
৭। তদেব, পৃ- ৮৩।
৮। তদেব।
৯। তদেব, পৃ- ৮৫।
১০। তদেব, পৃ- ৮৮।
১১। তদেব, পৃ- ৯০।
১২। তদেব, পৃ- ২১৬-২১৭।
১৩। Geraldine Forbes, Women in Colonial India: Essays
on Politics, Medicine and Historiography, New Delhi, 2005, p-19.
১৪। নারী শ্রমিক ও শ্রম আইন, মানভূম আনন্দ আশ্রম নিত্যানন্দ ট্রাস্ট, লৌলাহা,
পুরুলিয়া।
গ্রন্থপঞ্জীঃ
১। Geraldine Forbes, Women in Colonial India: Essays
on Politics, Medicine and Historiography, New Delhi, 2005.
২। সারদা ঘোষ, নারীচেতনা ও সংগঠনঃ ঔপনিবেশিক বাংলা, ১৮২৯-১৯২৫, কলকাতা ২০১৩।
৩। কৈলাসবাসিনী দেবী, হিন্দু অবলাকুলের বিদ্যাভাষ ও তাহার সমুন্নতি, কলকাতা
১৭৮৭ শকাব্দ।
৪। নারী শ্রমিক ও শ্রম আইন, মানভূম আনন্দ আশ্রম নিত্যানন্দ ট্রাস্ট, লৌলাহা,
পুরুলিয়া।
৫। ‘স্ত্রীবিদ্যা’, সম্বাদ প্রভাকর, ৭.৫.১৮৪৯।
দারুন লিখেছেন
ReplyDelete😊
DeleteNice
ReplyDelete😊
Delete